মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

মধুমতি নদী

মধুমতি নদী:

কুষ্টিয়া জেলার উত্তরে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১৯ কিমি ভাটিতে তালবাড়িয়া নামক স্থানে উৎপত্তি হয়েছে গড়াই নদীর। এই গড়াই নদী অনেক পথ অতিক্রম করে মাগুরা-ফরিদপুর জেলার সীমানা বরাবর প্রবাহিত হয়ে মধুমতি নামে নড়াইল ও বাগেরহাট জেলার মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে।

গড়াই নদী মাগুরা জেলায় প্রবেশ করার পর কুমার নদীর সাথে মেশে। কুমারের শাখা বারাসিয়ার স্রোতের সাথে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়। বারাসিয়া নদী হতে এলেংখালি নামে একটি খাল কাটানো হয়। এই কাটানো খালটিই বর্তমানে এলেংখালি নদী। অতীতে বারাসিয়া নিম্নাংশ থেকে নদীর নাম ছিল মধুমতি। এখন এলেংখালি নদী বিস্তৃত হয়ে মধুমতি নামে কথিত হয়।

এলেংখালি মধুমতি স্রোতধারা মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর উপজেলার দক্ষিণ পাশ হতে নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার লাহুড়িয়া কালীগঞ্জ প্রবেশ করে। এরপর নড়াইলের আজমপুর, ঝাউডাঙ্গা, শালনগর, শিয়েরবর, পারশালনগর, চাঁচই-ধানইড়, আড়িয়ারা, আমডাঙ্গা, কালনা, মহিষাপাড়া, ডিগ্রিরচর, লঙ্কাচর, ইতনা, ঘাগা, কোটাকোল গ্রামের পাশ দিয়ে পূর্ব-পশ্চিমগামী হয়ে আঁঠারোবাঁকি, ঘাঘর প্রভৃতি নদীর স্রোতের সম্মিলনে বলেশ্বর নাম ধারণ করে সাগরে পতিত হয়েছে।

নবগঙ্গার মতো মধুমতি নদীর তীরে কয়েকশ বছরের হাটবাজার, দালানকোটা, মন্দির মসজিদ গড়ে উঠেছে। শ্যামনগরের জোড়বাংলা মন্দির বিখ্যাত। এখন তা জরাজীর্ণ। শালনগর ইউনিয়নের অপর পাড়ে ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলা অবস্থিত।

নদীটি ভাঙনপ্রবণ। প্রতিবছর কিছু কিছু পরিবারের ঘর-বাড়ি, জমি-জিরাত, অস্থাবর-স্থাবর সম্পত্তি এই নদীগর্ভে বিলীন হয়। এখন মধুমতি নদী পূর্বের মতো নাব্যতা নেই। পূর্বে নড়াইল জেলার ইতনা, ধলুইতলা ও বড়দিয়াতে স্টিমার স্টেশন ছিল। আজ আর স্টিমার চলে না। তবে ইঞ্জিনচালিত নৌকা, বোট ইত্যাদি চলে সারাবছর।

নদীটির প্রবাহপথে যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে সেগুলো হলো মাগুরা জেলা মোহাম্মদপুর উপজেলা, ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারি, আলফাডাঙ্গা উপজেলা, নড়াইল জেলার লোহাগড়া ও কালিয়া উপজেলা, গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ সদর ও টুঙ্গিপাড়া এবং বাগেরহাট জেলার মোল্লারহাট, চিতরশারি ও কচুয়া উপজেলা।

মধুমতি নদীর দৈর্ঘ্য ১৩৭ কিমি ও প্রশস্ততা গড়ে ৫০০ মিটার। গভীরতার গড় ১০.৫ মিটার এবং নদী অববাহিকার আয়তন ৬৫০ বর্গ কিমি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড(বাপাউবো) কর্তৃক প্রদত্ত নদী আই ডি নং- ২৪১।

নদীতে সারা বছরই ছোট নৌযান, ইঞ্জিনচালিত বড় বড় নৌকা ও লঞ্চ চলাচল করতে পারে। মার্চ মাসের দিকে পানির প্রবাহ একটু কমে যায়। তখন নদীর কোথাও কোথাও পানির গভীরতা ৩.৫ মিটারে নেমে যায়। বর্ষা মৌসুমে অর্থাৎআগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বেশি পানি প্রবাহিত হয়। তখন নদীর দুকূলে কোথাও কোথাও ভাঙন সৃষ্টি হয়। পানিপ্রবাহের আনুমানিক পরিমাণ ১১৬৩০ কিউবিক মিটার/সেকেন্ড।

নদীটি জোয়ার-ভাটা দ্বারা প্রভাবিত। নদীর অববাহিকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নবগঙ্গা-মধুমতি সেচ প্রকল্প রয়েছে। আর এই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে মোল্লারহাট উপজেলা সদর, নড়াইল জেলাস্থ বড়দিয়া বন্দর। ভাটিয়াপাড়া ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে এই নদীর উপর মধুমতি সেতু নির্মিত হয়েছে। নদীটি ভাঙন ও বন্যাপ্রবণ বলে এর তীরে বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে ৮৮ কিমি।

বারাসিয়া ও মধুমতি নদীর সঙ্গমস্থলের পাশে অবস্থিত ভাটিয়াপাড়া ঘাট। এটি অর্ধশতাব্দী পূর্বেও একটি বিখ্যাত বাণিজ্যপ্রধান স্থান ছিল। ভাটিয়াপাড়া ঘাটত হতে ৫-৬ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে মধুমতি পার হয়ে নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলাস্থ ইতনা একটি প্রাচীন গ্রাম। এখানে একটি অপূর্ব কারুকার্যখচিত মঠ আছে। মঠতি ঘোষ-দুহিতার মঠ নামে পরিচিত। এই ইতনা গ্রামে ঔপন্যাসিক নীহাররঞ্জন গুপ্তের রপত্রিকনিবাস ছিল।

মধুমতি নদীতীরে মাগুরা জেলার বর্তমান উপজেলা শহর মোহাম্মদপুর অবস্থিত। এই মোহাম্মদপুরেই রাজা সীতারাম রায়ের রাজধানী ছিল। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে সীতারামের জন্ম হয়। কথিত আছে সীতারাম প্রতাপশালী রাজা ছিলেন। তিনি তাঁর এলাকার মানুষের পানীয় জলকষ্ট নিবারণের প্রচুর দিঘি-পুকুর খনন করতেন এবং প্রতিদিন নতুন নতুন দিঘির জলে স্নান করতেন। মোহাম্মদপুরে সীতারামের কীর্তির মধ্যে প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, রামসাগর, সুখসাগর ও কৃষ্ণসাগর নামক দিঘি, দোলমঞ্চ ও রাজভবনের ধ্বংসাবশেষ, দশভূজা মন্দির, কৃষ্ণজীর মন্দির প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

মোহাম্মদপুর এখন পল্লীগ্রাম মাত্র। এর সমৃদ্ধির সময়ে মধুমতি নদী এই স্থানের প্রান্ত দিয়ে প্রবাহিত ছিল। বর্তমানে নদী প্রায় কিমি খানিক দূরে সরে গেছে। মধুমতি নদীতীরে নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলা আরেকটি বিখ্যাত স্থান। কথিত হয়, মগ ও বর্গীর অত্যাচারের হাত হতে রক্ষা পাবার জন্য দুর্গম জলাভূমির মধ্যে গ্রামটি স্থাপিত হয়।

জনৈক ইংরেজ লেখকের মতে সুমিষ্ট জল বা মধু বহনকারী নদী বলে এই নদীর নাম মধুমতি হয়েছে। একসময় সুন্দরবন অঞ্চল থেকে অনেক নৌকা এই নদী দিয়ে মধু সংগ্রহ করে চলাচল করতো।

মধুমতি নদী অতীতে যশোর রাজ্যের পূর্বের শেষ সীমা ছিল আর পশ্চিমের সীমা ছিল সাতক্ষীরা ইছামতি নদী। প্রাচীন গ্রন্থ দিগ্নিজয় প্রকাশ ও তন্ত্র-এ যশোর রাজ্যের সীমা বর্ণনার ক্ষেত্রে মধুমতি ইছামতি নদীর নামের উল্লেখ পাওয়া যায়- 

‘পূর্বে মধুমতি সীমা, পশ্চিমে ইছামতী

 বাদাভূমি দক্ষিণে চকুশোদ্বীপো হিচত্তরে ’

ওয়েস্টল্যাণ্ড বলেছেন, যশোর রাজ্যের দক্ষিণসীমা সুন্দরবনের প্রান্তসীমা পশ্চিমে ইছামতি নদীর পূর্বভাগ, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাংশ ব্যতীত সমগ্র যশোর জেলা উত্তরে নদীয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। নিখিলনাথ রায়ও যশোরের পূর্ব সীমানা মধুমতি পর্যন্ত বিস্তৃত বলে উল্লেখ করেছেন।